প্রতিদিনের খরচ থেকে বেঁচে যাওয়া
টাকা গুলো রেখে দিই।
আমাকে পড়ানোর জন্যে আমার আব্বু
আম্মু কত কস্ট করছেন;তাদের জন্য কিছুই করতে পারি না।
আজ বিকেলে বাড়ি যাব,সামনে ১৬তারিখে
ঈদ।ভাবছি আম্মুর জন্যে একটা শাড়ি,আব্বুর জন্যে একটা পাগড়ী আর ছোট ভাইটার জন্যে একটা
পানজাবি কিনব…
একা একা হাটছি ,রাস্তায় অনেক
মানুষের ভিড়।কেও কেও আবার ধাক্কাও লাগিয়ে দিয়ে সরি বলে চলে যাচ্ছে। আমি ওগুলো কিছু
মনে করি না।
রাস্তার পাশেই অনেক গুলো তরমুজের
দোকান।
তরমুজ দেখে আমারও নিতে মন চাইল।
ভাই,কত করে কেজি?
-২২টাকা
কিছু কম হবে?
-২০টাকা করে দিয়েন।
আমি দামাদামি করাতে ১৮ টাকা করে
একটা ৫কেজি ওজনের তরমুজ নিয়ে নিলাম।আমার এই তরমুজ কেনা একজন অনেকক্ষন ধরে লক্ষ করছিল।
দোকানির হাত থেকে তরমুজ নিয়ে
রুমের দিকে হাটতে শুরু করলাম।
-এই বাবা,এই বাবা,একটু শোন?
আমি পেছন ফিরে দেখি এক মধ্যবয়সী
লোক।
হ্যা বলেন।
-আমায় একটু তরমুজ খেতে দিবে?অনেক
দিন থেকে খুব খেতে ইচ্ছে করছিলো।শুধু চেয়ে চেয়ে দেখি কিন্তু কেনার সামর্থ্য নেই,কতজনকে
বলেছি একটু দেবার জন্য কিন্তু কেও রাজি হয়নি।
বাবা আমায় ফিরিয়ে দিওনা।
-খুব মায়া হলো,
চলেন আমার সাথে।
ব্যক্তিটা যেন হাটতে পারছে না।ভালো
করে লক্ষ করে দেখলাম তার ডান পা কেন জানি ফোলা।
পাশের এক পরিচিত দোকান থেকে একটা
ছুরি নিয়ে রাজশাহী কলেজ মাঠে আসলাম।নিরিবিলি জায়গায় বসে তাকেও বসতে বললাম।
কথা বলতে বলতে তরমুজটা কাটতে
লাগলাম।
-আপনার নাম কি?
মোতালেব
-কোথায় থাকেন?
ষ্টেশন
ছেলে মেয়ে কেও নেই?
এক ছেলে দুই মেয়ে, দুই মেয়ের
বিয়ে দিয়েছি আর গত বছর ছেলে বিয়ে করেছে।
ছেলেটা আমায় বাড়ি থেকে বের করে
দিয়েছে,বোউকে নিয়ে কোন মতে আছি।
বলতে বলতে তার কন্ঠ ভারি হয়েগেল।
আমি তাকে তরমুজের একফালি দিলাম,
একবার সে আমার দিকে তাকাছে আবার তরমুজের দিকে তাকাচ্ছে।
ফালিটা হাতে নিয়ে কামড় দিল।
-তা কেন বের করেদিল আপনাদের?
আমার কিছু জমি ছিল,সে গুলো চাষ
করতাম।ধান ,কুশির ,তিল নানা কিছু ফলাতাম।এমন কি অন্যের জমি ধার করে চাষ করতাম।
হাটের দিনে হাট শেষে একটা তরমুজ
নিয়ে বাড়ি ফিরতাম।তখন তো তরমুজের দাম কম ছিলো।
ছেলেটা হাট থেকে মাথায় করে তরমুজ
নিয়ে বাড়ি ফিরত।সবাই মিলে কত মজা করে খেতাম।
কথা গুলো বলতে বলতে ব্যক্তিটার
চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
ছেলে আমার ভালোই ছিলো,যেই না
বিয়ে করল অমনি কেমন যেন বদলাতে শুরু করল।শুধু আমার ছেলেটাকে বলতো সব জমি লিখে দিতে,এমনি
আমাকেও বলতে শুরু করল।
হঠাৎ একদিন রাত্রে আসলাম আমার
পা ধরে বলল,
-আব্বা জমি গুলো সব আমার নামে
লিখে দেন,আমি আপনাকে বসে বসে খাওয়াব।
আমি ওর বিনয়ী ভাব দেখে জীবনের
সব চেয়ে বড় ভুলটা করে বসলাম।ঠিক মত খাবারও দিতনা।ছোট বিষয় নিয়ে হলেও ওর মার সাথে খারপ
ব্যবহার করত।
এভাবে অনেক বছর পার করলাম।সম্পত্তি
হারা মানূষ হয়ে মানূষের জমিতে প্যাঠ দিতাম।
এখন আর সেই শক্তি নেই।
শীতের রাত,ছেড়া কাঁথায় নিয়ে শুয়ে
থাকি আর ভাবি কত আসলাম যখন ছোট ছিল তাকে বুকে
রেখে রাত পার করেছি,এতটুকু কষ্ট পেতে দেইনি,অথচ সেই ছেলেই আমাকে কষ্ট দিয়েছে নিজের
ভিটাতেও থাকতে দেই নি।
অনেক কথাই বললেন,
আমার খুব মায়া হলো কথা বলছেই
আর কাদছে,
তার নাকি মানূষের দারে চাইতে
লজ্জা লাগে।
খাওয়া শেষে তাকে নিয়ে আবার বাজারের
দিকে গেলাম, ৩ কেজি বাদাম আর একটা ঝাঁকা কিনে দিলাম।
চাচা,বাদাম বিক্রি করে জীবিকা
নির্বাহ করার চেষ্টা করবেন আল্লাহ যদি মুখতুলে চায় তবে আর কারো কাছে হাত পাতা লাগবে
না।
আর আমার জন্য একটু দোয়া করবেন।
ব্যক্তিটা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে
দোয়া করলেন।
বাজারে গিয়ে বাড়ির সবার জন্য
কিছু না কিছু কিনলাম।বিকেলে বাস যোগে বাড়ি ফিরলাম।
রাত্রে খেতে বসে সেই ব্যক্তিটার
কথা বললাম।আম্মু খুব খুশি হলেন।
দেখতে দেখতে ঈদ শেষে আবার রাজশাহীর
উদ্দেশ্যে রওনা হলাম,আমায় বিদায় দেবার সময় আম্মু আমার মাথায় চুমি দিয়ে বললেন ,আমি যেন
এমন কাজ পারলে আরো করি।
এভাবে অনেক দিন কেটে গেল,
মন খারাপ হলে বা নিজেকে একা একা
লাগলে পদ্মার পাড়ে গিয়ে একা একা বসে থাকি,
কতজন তার প্রেমিকা কে নিয়ে ঘুরে।
আমার কেও নেই ,ভাবি থাকলে কেমন
মজা হতো।
একদিন এভাবেই বসে একা একা বসে
পদ্মার পাড় দিয়ে হাঁটছি,
-কেমন আছ বাবা?
আমি ভালো করে তাকিয়ে দেখি সেই
ব্যক্তিটা।
আমি ভালো আছি,আপনি কেমন আছেন?আপনার
ব্যবসা দেখছি অনেক বড় হয়েছে?
দেখছি বাদামের সাথে চকলেট,ছিগারেট,ছোলা
সহ অনেক কিছুই বিক্রি করছে।
তার সাথে কিছু কথা বলে বিদায়
নেবার সময় আমার হাতে অনেক গুলো বাদাম দিয়ে দিল।
আমিও না করলাম না।হাতে নিয়ে
একটা বাদাম ছিলে মুখে দিলাম,
বাদামটা এত মজা লাগছে কেন?
এ মজা না কোন ভালো কাজের ভালোলাগা?
ভাবতে ভাবতে রুমের দিকে রওনা
দিলাম…
রাজশাহী থেকে
মারুফ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন